মনিটর কেনার সময় অনেক মডেলের গায়ে ১ মিলিসেকেন্ড MPRT(Moving Picture Response Time) অথবা ১ মিলিসেকেন্ড GTG(Gray-to-Gray) লেখা দেখা যায়। দুটিই ১ মিলিসেকেন্ড হওয়ায় এগুলোকে একই মনে হতে পারে। বাস্তবে এমপিআরটি ও জিটুজি দুটি আলাদা পদ্ধতিতে মনিটরের প্রতিক্রিয়া সময় পরিমাপ করে।
সহজভাবে বললে, জিটুজি পিক্সেলের রং পরিবর্তনের গতি বোঝায়। অন্যদিকে এমপিআরটি চলমান ছবি চোখে কতক্ষণ দৃশ্যমান থাকে এবং কতটা পরিষ্কার দেখায়, সেটি বোঝায়। তাই ১ মিলিসেকেন্ড এমপিআরটি ও ১ মিলিসেকেন্ড জিটুজিকে সরাসরি সমান বলা যায় না।
জিটুজি কী?
জিটুজির(GTG) অর্থ হলো ধূসর থেকে ধূসর। এটি একটি পিক্সেলের এক ধূসর স্তর থেকে অন্য ধূসর স্তরে যেতে কত সময় লাগে, তা পরিমাপ করে। একটি গেমের দৃশ্য পরিবর্তনের সময় মনিটরের পিক্সেলগুলোকে খুব দ্রুত রং ও উজ্জ্বলতা বদলাতে হয়। পিক্সেল দ্রুত পরিবর্তিত হলে আগের দৃশ্যের ছাপ কম থাকে। পরিবর্তন ধীর হলে চলমান চরিত্র বা বস্তুর পেছনে ছায়া কিংবা লেজের মতো দাগ দেখা দিতে পারে। জিটুজির ক্ষেত্রে সংখ্যা যত কম, পিক্সেলের পরিবর্তন তত দ্রুত হওয়ার কথা। তাই ১ মিলিসেকেন্ড জিটুজি একটি দ্রুত প্রতিক্রিয়া সময় নির্দেশ করে।
তবে মনিটরের গায়ে লেখা ১ মিলিসেকেন্ড জিটুজি সাধারণত প্রতিটি রং পরিবর্তনের গড় ফল নয়। অনেক সময় এটি সবচেয়ে দ্রুত একটি নির্দিষ্ট পরিবর্তনের ফল অথবা সর্বোচ্চ ওভারড্রাইভ ব্যবহারের ফল হতে পারে। ফলে স্বাভাবিক ব্যবহারে সব পিক্সেল পরিবর্তন ঠিক ১ মিলিসেকেন্ডে সম্পন্ন হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
এমপিআরটি কী?
এমপিআরটির(MPRT) অর্থ হলো চলমান ছবির প্রতিক্রিয়া সময়। একটি চলমান ছবি বা পিক্সেল চোখে কতক্ষণ দৃশ্যমান থাকে, এই পরিমাপ তার সঙ্গে সম্পর্কিত।
গেমে কোনো চরিত্র দ্রুত দৌড়ালে, ক্যামেরা ঘোরালে কিংবা গাড়ি দ্রুত চললে ছবিতে ঝাপসাভাব দেখা দিতে পারে। পিক্সেল দ্রুত রং পরিবর্তন করলেও প্রতিটি ছবি পর্দায় কিছু সময় ধরে দৃশ্যমান থাকায় এই ঝাপসাভাব তৈরি হতে পারে।
এমপিআরটি মূলত চলমান দৃশ্য কতটা পরিষ্কার দেখাবে, সে বিষয়ে ধারণা দেয়। ১ মিলিসেকেন্ড এমপিআরটি বলতে সাধারণত চলমান ছবির দৃশ্যমান থাকার সময় কমানো হয়েছে বোঝায়।
অনেক মনিটর ব্যাকলাইট দ্রুত জ্বালানো-নেভানোর বিশেষ ব্যবস্থা ব্যবহার করে ১ মিলিসেকেন্ড এমপিআরটি দাবি করে। এই ব্যবস্থা চালু করলে চলমান দৃশ্য পরিষ্কার দেখাতে পারে। তবে এর ফলে পর্দার উজ্জ্বলতা কমে যেতে পারে এবং কারও কারও চোখে ঝিলমিল ভাব অনুভূত হতে পারে।
১ মিলিসেকেন্ড এমপিআরটি ও ১ মিলিসেকেন্ড জিটুজির মূল পার্থক্য
বিষয়
১ মিলিসেকেন্ড জিটুজি
১ মিলিসেকেন্ড এমপিআরটি
কী পরিমাপ করে
পিক্সেলের এক ধূসর স্তর থেকে অন্য স্তরে যাওয়ার সময়
চলমান ছবি চোখে কতক্ষণ দৃশ্যমান থাকে
প্রধান লক্ষ্য
পিক্সেলের রং পরিবর্তনের গতি
চলমান দৃশ্যের ঝাপসাভাব কমানো
কীভাবে অর্জিত হতে পারে
দ্রুত প্যানেল ও ওভারড্রাইভের মাধ্যমে
বিশেষ চলমান-ছবি পরিষ্কারক ব্যবস্থা ব্যবহার করে
গেমে সুবিধা
ছায়া ও লেজের মতো দাগ কমাতে সাহায্য করে
দ্রুত চলমান বস্তু পরিষ্কার দেখাতে সাহায্য করে
সম্ভাব্য সীমাবদ্ধতা
অতিরিক্ত ওভারড্রাইভে উল্টো রঙের ছায়া দেখা দিতে পারে
উজ্জ্বলতা কমতে বা ঝিলমিল ভাব দেখা দিতে পারে
সব সময় চালু থাকে?
সাধারণত প্যানেলের স্বাভাবিক কার্যক্রমের অংশ
অনেক ক্ষেত্রে আলাদা ব্যবস্থা চালু করতে হয়
একই মনিটরে দুটি আলাদা সংখ্যা থাকতে পারে কেন?
জিটুজি ও এমপিআরটি একই বিষয় পরিমাপ করে না। তাই একটি মনিটরে ১ মিলিসেকেন্ড এমপিআরটি থাকলেও তার জিটুজি ১ মিলিসেকেন্ড নাও হতে পারে।
উদাহরণ হিসেবে, কোনো মনিটরের পিক্সেল পরিবর্তনে ৪ মিলিসেকেন্ড লাগতে পারে। কিন্তু বিশেষ চলমান-ছবি পরিষ্কারক ব্যবস্থা ব্যবহার করে সেটি ১ মিলিসেকেন্ড এমপিআরটি হিসেবে প্রচার করা হতে পারে। এতে দ্রুত চলমান দৃশ্যের ঝাপসাভাব কমবে, কিন্তু পিক্সেলের প্রকৃত রং পরিবর্তনের গতি ১ মিলিসেকেন্ড হয়ে যাবে না।
আবার কোনো মনিটরে ১ মিলিসেকেন্ড জিটুজি থাকতে পারে, কিন্তু বিশেষ ব্যবস্থা ছাড়া চলমান দৃশ্যে কিছু ঝাপসাভাব দেখা যেতে পারে। কারণ দ্রুত পিক্সেল পরিবর্তন এবং ছবির দৃশ্যমান থাকার সময় এক বিষয় নয়।
গেমিংয়ের জন্য কোনটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ?
গেমিংয়ের জন্য দুটিই গুরুত্বপূর্ণ, তবে মনিটরের প্যানেলের প্রকৃত গতি বোঝার ক্ষেত্রে জিটুজি সাধারণত বেশি কাজে আসে। এটি পিক্সেল কত দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে এবং চলমান বস্তুর পেছনে ছায়া তৈরি হওয়ার ঝুঁকি কেমন, সে বিষয়ে ধারণা দেয়।
অন্যদিকে দ্রুতগতির গেমে চলমান চরিত্র বা লক্ষ্য পরিষ্কারভাবে দেখতে এমপিআরটি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বিশেষ করে প্রতিযোগিতামূলক গেমে ক্যামেরা দ্রুত ঘোরানোর সময় কম ঝাপসাভাব চাইলে ১ মিলিসেকেন্ড এমপিআরটি সুবিধা দিতে পারে।
তবে শুধু সংখ্যার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। ভালো বাস্তব জিটুজি ফলসহ একটি মনিটর সাধারণত সব ধরনের গেমে ভারসাম্যপূর্ণ অভিজ্ঞতা দেয়। আর ১ মিলিসেকেন্ড এমপিআরটি তখনই বেশি কাজে আসে, যখন এর বিশেষ ব্যবস্থা চালু করেও ছবির উজ্জ্বলতা ও আরাম আপনার কাছে গ্রহণযোগ্য থাকে।
১ মিলিসেকেন্ড জিটুজি কি সব সময় সত্যিকারের ১ মিলিসেকেন্ড?
পণ্যের গায়ে লেখা ১ মিলিসেকেন্ড জিটুজি অনেক সময় সর্বোচ্চ ওভারড্রাইভ অবস্থায় পাওয়া ফল। ওভারড্রাইভ পিক্সেলকে দ্রুত পরিবর্তনে সাহায্য করে। তবে এটি অতিরিক্ত বাড়ালে চলমান বস্তুর চারপাশে উজ্জ্বল বা উল্টো রঙের ছায়া দেখা দিতে পারে।
ফলে সবচেয়ে দ্রুত সেটিং সব সময় সবচেয়ে ভালো ছবি দেয় না। মাঝারি ওভারড্রাইভে সামান্য বেশি প্রতিক্রিয়া সময় পাওয়া গেলেও ছবিতে কম অস্বাভাবিক ছায়া থাকতে পারে। তাই শুধু ঘোষিত সংখ্যা না দেখে স্বাভাবিক সেটিংয়ে মনিটরের ফল কেমন, সেটিও দেখা প্রয়োজন।
১ মিলিসেকেন্ড এমপিআরটি কি সব সময় ব্যবহার করা যায়?
অনেক মনিটরে ১ মিলিসেকেন্ড এমপিআরটি পেতে আলাদা চলমান-ছবি পরিষ্কারক ব্যবস্থা চালু করতে হয়। এটি চালু থাকলে কিছু সীমাবদ্ধতা দেখা দিতে পারে:
পর্দার উজ্জ্বলতা কমে যেতে পারে।
চোখে ঝিলমিল ভাব অনুভূত হতে পারে।
একই সঙ্গে অভিযোজিত সমন্বয় ব্যবস্থা ব্যবহার করা নাও যেতে পারে।
স্থির ছবি বা সাধারণ কাজের সময় এটি প্রয়োজন নাও হতে পারে।
কম বা অস্থির ছবির হারে ফল আশানুরূপ নাও হতে পারে।
অর্থাৎ ১ মিলিসেকেন্ড এমপিআরটি মনিটরের সব সময়ের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া সময় নয়। অনেক ক্ষেত্রে এটি একটি নির্দিষ্ট ব্যবস্থা চালু করার পর পাওয়া ফল।
১ মিলিসেকেন্ড মানেই কি কোনো বিলম্ব থাকবে না?
না। এমপিআরটি ও জিটুজি কোনোটিই পুরো মনিটরের নির্দেশ গ্রহণের বিলম্ব বোঝায় না। মাউস বা নিয়ন্ত্রক থেকে নির্দেশ দেওয়ার পর সেটি পর্দায় দেখাতে মোট কত সময় লাগে, সেটি আলাদা বিষয়।
একটি মনিটরে ১ মিলিসেকেন্ড জিটুজি লেখা থাকলেও তার মোট নির্দেশ গ্রহণের বিলম্ব বেশি হতে পারে। একইভাবে ১ মিলিসেকেন্ড এমপিআরটি থাকলেই নির্দেশ সঙ্গে সঙ্গে পর্দায় দেখা যাবে এমন নয়।
তাই প্রতিযোগিতামূলক গেমের জন্য মনিটর বাছাই করলে প্রতিক্রিয়া সময়ের পাশাপাশি পরীক্ষায় পাওয়া মোট বিলম্বও যাচাই করা ভালো।
মনিটর কেনার সময় কোন তথ্য দেখবেন?
১ মিলিসেকেন্ড এমপিআরটি বা ১ মিলিসেকেন্ড জিটুজি দেখলেই সিদ্ধান্ত না নিয়ে কয়েকটি বিষয় যাচাই করুন:
২. স্বাভাবিক ওভারড্রাইভে ফল কেমন: সর্বোচ্চ সেটিংয়ে অস্বাভাবিক ছায়া তৈরি হচ্ছে কি না যাচাই করুন।
৩. এমপিআরটি চালু করলে উজ্জ্বলতা কমে কি না: বিশেষ ব্যবস্থা ব্যবহারের পর ছবিটি আপনার কাছে আরামদায়ক কি না দেখুন।
৪. বাস্তব পরীক্ষার ফল দেখুন: ঘোষিত সংখ্যার পাশাপাশি চলমান দৃশ্যের ঝাপসাভাব ও ছায়া সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য পর্যালোচনা দেখুন।
৫. নিজের ব্যবহারের ধরন বিবেচনা করুন: নিয়মিত ও সাধারণ গেমিংয়ের জন্য ভালো জিটুজি ফল বেশি ব্যবহারিক। দ্রুত প্রতিযোগিতামূলক গেমে কম এমপিআরটি অতিরিক্ত সুবিধা দিতে পারে।
তাহলে কোনটি বেছে নেবেন?
যদি দুটি মনিটরের মধ্যে একটি ১ মিলিসেকেন্ড জিটুজি এবং অন্যটি শুধু ১ মিলিসেকেন্ড এমপিআরটি দেয়, তাহলে ঘোষিত সংখ্যা দেখে প্রথমটিকে সাধারণত বেশি শক্তিশালী মনে হতে পারে। কারণ জিটুজি প্যানেলের পিক্সেল পরিবর্তনের গতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
তবে শুধু এই একটি তথ্য দিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না। ১ মিলিসেকেন্ড জিটুজি যদি কেবল এমন একটি ওভারড্রাইভে পাওয়া যায় যেখানে উজ্জ্বল ছায়া তৈরি হয়, তাহলে সেটি বাস্তবে খুব উপকারী নয়। একইভাবে ১ মিলিসেকেন্ড এমপিআরটি যদি উজ্জ্বলতা অনেক কমিয়ে দেয়, সেটিও সবার জন্য আরামদায়ক হবে না।
সবচেয়ে ভালো পছন্দ হলো এমন মনিটর, যার স্বাভাবিক সেটিংয়ে পিক্সেল দ্রুত পরিবর্তিত হয়, চলমান দৃশ্যে কম ছায়া দেখা যায় এবং প্রয়োজন হলে কার্যকর এমপিআরটি ব্যবস্থা ব্যবহার করা যায়।
শেষ কথা
১ মিলিসেকেন্ড এমপিআরটি ও ১ মিলিসেকেন্ড জিটুজি একই নয়। জিটুজি পিক্সেলের রং পরিবর্তনের গতি পরিমাপ করে, আর এমপিআরটি চলমান ছবি কতক্ষণ দৃশ্যমান থাকে এবং কতটা ঝাপসা দেখায়, তার সঙ্গে সম্পর্কিত।
মনিটরের প্রকৃত পিক্সেল গতি বোঝার জন্য জিটুজি বেশি কার্যকর। দ্রুত চলমান দৃশ্যের ঝাপসাভাব কমানোর ক্ষেত্রে এমপিআরটি গুরুত্বপূর্ণ। তাই শুধু ১ মিলিসেকেন্ড লেখা দেখে নয়, সেটি কোন পরিমাপ, কীভাবে পাওয়া হয়েছে এবং স্বাভাবিক ব্যবহারে মনিটর কেমন ফল দেয় এসব বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিন।
Leave a comment